সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: শিল্পীর তুলি নাকি ভবিষ্যতের হুমকি?
মাত্র কয়েক বছর আগেও যা ছিল সায়েন্স ফিকশনের গল্প, আজ তাই আমাদের কঠিন বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এখন শুধু ডেটা বিশ্লেষণ বা জটিল হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মানুষের সৃজনশীল জগতেও তার পদার্পণ ঘটেছে। চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) কবিতা লিখছে, মিডজার্নি (Midjourney) এঁকে দিচ্ছে পুরস্কারজয়ী ছবি, আর হালের এআই মডেলগুলো তৈরি করছে সুর। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনই শিল্পী, লেখক, সুরকার এবং ডিজাইনারদের মনে তৈরি করেছে এক গভীর সংশয়—এআই কি মানুষের সৃজনশীলতার পরিপূরক, নাকি প্রতিস্থাপক?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, যদি একটি অ্যালগরিদম মুহূর্তের মধ্যে নিখুঁত ছবি তৈরি করতে পারে বা আবেগঘন লেখা লিখতে পারে, তাহলে মানব শিল্পীর প্রয়োজনীয়তা কোথায়? কপিরাইট এবং মৌলিকত্বের মতো নৈতিক প্রশ্নগুলোও সামনে আসছে। এআই-জেনারেটেড শিল্পের মালিকানা কার—যে ব্যবহারকারী কমান্ড দিয়েছে তার, নাকি যে অ্যালগরিদম এটি তৈরি করেছে তার? এই প্রযুক্তি সৃজনশীল পেশাগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলছে কিনা, তা নিয়েও চলছে ব্যাপক বিতর্ক। এর ফলে বহু শিল্পী তাদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, যা বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ।
অন্যদিকে, একটি ভিন্ন চিত্রও দেখা যাচ্ছে যেখানে সৃজনশীল ব্যক্তিরা এআই-কে হুমকি হিসেবে না দেখে একটি শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করছেন। ঠিক যেমন ফটোগ্রাফি আসার পর চিত্রকলা শেষ হয়ে যায়নি, বরং নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিল, তেমনই এআই শিল্পীদের জন্য একটি নতুন হাতিয়ার হতে পারে। একজন লেখক গল্পের প্রাথমিক ধারণা বা প্লট তৈরিতে, একজন ডিজাইনার লোগোর কনসেপ্ট ভাবতে কিংবা একজন সুরকার নতুন সুরের অনুপ্রেরণা পেতে এআই-এর সাহায্য নিতে পারেন। এটি সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত এবং সহজ করে তুলতে পারে, যা শিল্পীকে আরও জটিল ও গভীর চিন্তায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
শেষ পর্যন্ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা এটিকে কীভাবে ব্যবহার করব তার ওপর। এআই হয়তো রুটিনমাফিক বা পুনরাবৃত্তিমূলক সৃজনশীল কাজগুলো করতে পারবে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা, আবেগ, এবং দূরদৃষ্টির স্থান নেওয়া তার পক্ষে কঠিন। সম্ভবত ভবিষ্যৎ হলো মানুষ ও যন্ত্রের এক সম্মিলিত সৃজনশীলতার যুগ, যেখানে প্রযুক্তি হবে মানুষের কল্পনার ডানা মেলার সহায়ক। তাই একে হুমকি হিসেবে না দেখে, এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন পথে হাঁটাই হতে পারে বুদ্ধিমানের কাজ।
