এআই বিপ্লব: সৃজনশীলতা ও মেধা স্বত্বের ভবিষ্যৎ কি বদলে যাবে?
আজকের প্রযুক্তিগত বিশ্বের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী উদ্ভাবনগুলির মধ্যে অন্যতম হলো জেনারেটিভ এআই (Generative AI)। চ্যাটজিপিটি, ডাল-ই এবং মিডজার্নির মতো মডেলগুলি আমাদের দেখিয়েছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু তথ্য বিশ্লেষণ বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজই নয়, নতুন টেক্সট, ছবি, অডিও এবং ভিডিও তৈরি করতেও সক্ষম। এই প্রযুক্তি মুহূর্তের মধ্যে গল্প, কবিতা, শিল্পকর্ম বা মিউজিক তৈরি করে দিতে পারে, যা একসময় কেবল মানুষের বিশেষ ক্ষমতা বলে মনে করা হতো। এর ফলে সৃজনশীল কাজের প্রক্রিয়া অনেকটাই সহজ হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পেশাদার শিল্পীরাও নতুন দিগন্ত দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু এই বিস্ময়কর ক্ষমতা একই সাথে জন্ম দিয়েছে একাধিক জটিল প্রশ্নের।
জেনারেটিভ এআই-এর উত্থান বিশেষত মেধা স্বত্ব (Intellectual Property - IP) সংক্রান্ত ধারণায় এক বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। এআই মডেলগুলি লক্ষ লক্ষ বিদ্যমান শিল্পকর্ম, লেখা বা ডেটা ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ নেয়, যার মধ্যে অনেকগুলিরই স্বত্বাধিকারী রয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এই ডেটা ব্যবহার কি ন্যায্য ব্যবহার (Fair Use) হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি তা স্বত্ব লঙ্ঘনের (Copyright Infringement) আওতায় পড়বে? এআই দ্বারা তৈরি করা কোনো ছবি বা গানকে কে নিজের বলে দাবি করতে পারবে? এটি কি সেই এআই অপারেটরের স্বত্ব হবে, নাকি সেই ডেভেলপার কোম্পানির? অথবা, একটি অ্যালগরিদম কি আদৌ 'সৃষ্টিকর্তা' হিসেবে গণ্য হতে পারে? এই প্রশ্নগুলি বর্তমান আইনি কাঠামোতে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, যা শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
কেবল আইনি জটিলতাই নয়, জেনারেটিভ এআই সৃজনশীল শিল্প খাতের ভবিষ্যত নিয়েও গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন এটি নতুন সৃজনশীল সরঞ্জাম সরবরাহ করছে এবং কাজকে আরও কার্যকর করে তুলছে, অন্যদিকে তেমনি অনেক শিল্পী ও লেখক তাঁদের পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কায় ভুগছেন। অনেকেই মনে করছেন, এআই ধীরে ধীরে মানুষের সৃজনশীল কাজকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতি, আইনি কাঠামো এবং নৈতিক নির্দেশিকা। প্রযুক্তিবিদ, শিল্পী এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যা এআই-এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীলতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে, অথচ শিল্পীদের অধিকার ও মেধা স্বত্ব সুরক্ষিত রাখবে। এআই-এর এই নবজাগরণ মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি একটি অভিশাপ, তা নির্ভর করছে আমরা কীভাবে এর সাথে মানিয়ে নিয়েছি তার ওপর।